হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপের ঘোষণার পর এবার বৈশ্বিক ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও চাপের মুখে ফেলতে চাইছে ইরান। পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ইন্টারনেট কেব্ল ব্যবহারে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ফি আরোপের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ইন্টারনেট যোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সাবমেরিন কেব্ল ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স ও ট্রানজিট ফি দিতে হতে পারে। একই সঙ্গে এসব কেব্লের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব শুধুমাত্র ইরানি প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আমরা ইন্টারনেট কেব্লের ওপর ফি আরোপ করব।” এর পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগ সাগরতলের সাবমেরিন কেব্লের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড সেবা, সামরিক যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান এই কেব্লগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে এগুলোতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন শুধু ইন্টারনেটের গতি কমাবে না, বরং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্লাউড অবকাঠামো, অনলাইন ব্যবসা, দূরবর্তী কর্মসংস্থান ও স্ট্রিমিং সেবাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান মূলত তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত শক্তিতে রূপ দিতে চাইছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। এখন সেই পথের তলদেশে থাকা ডিজিটাল অবকাঠামোকেও প্রভাবের আওতায় আনতে চায় তেহরান।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফানদিয়ারির মতে, ইরানের এই বার্তা মূলত প্রতিরোধমূলক কৌশল। তার ভাষায়, “তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিশ্বশক্তিগুলো বহুবার ভাবতে বাধ্য হয়।”
তবে আন্তর্জাতিক আইন ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকটি সাবমেরিন কেব্লে বিনিয়োগ থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোই ইরানের জলসীমা এড়িয়ে ওমানের কাছাকাছি পথ ব্যবহার করেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। টেলিকম গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েকটি কেব্ল আংশিকভাবে ইরানি জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পক্ষে ইরানকে অর্থ প্রদান করাও জটিল হয়ে দাঁড়াবে। ফলে ইরান কীভাবে তাদের আইন মানতে বাধ্য করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এই উদ্যোগকে বৈধ প্রমাণে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনের কথা উল্লেখ করছে। তারা মিসরের সুয়েজ খালের উদাহরণও টানছে, যেখানে সাবমেরিন কেব্লের জন্য ট্রানজিট ও লাইসেন্স ফি নেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুয়েজ একটি কৃত্রিম জলপথ হলেও হরমুজ একটি প্রাকৃতিক প্রণালি; তাই দুই ক্ষেত্রের আইনি কাঠামো এক নয়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যদি সত্যিই সাবমেরিন কেব্লকে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
© All rights reserved Rajbari Express © 2025
এই নিউজ পোর্টালের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অথবা অডিও
অনুমতি ছাড়া ব্যাবহার বে-আইনি।