রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত জামির বিশ্বাস (৪৫) নামে এক ব্যক্তির চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে শতাধিক বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামগুলো কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
রোববার (২১ জুন) রাত ৯টার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জামির বিশ্বাস। তিনি পাংশা উপজেলার পাট্টা ইউনিয়নের ঢেঁপা-মাজাইল গ্রামের হোসেন আলী বিশ্বাসের ছেলে।
জমির সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ জুন বৃহস্পতিবার পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল ইউনিয়নের দড়ি বাংলাট গ্রামের আক্তার মণ্ডল ও তার চাচাতো ভাই আব্দুল হাকিম মণ্ডলের মধ্যে জমির সীমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখা দেয়। ওই সময় উভয় পক্ষের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আক্তার মণ্ডলের মামাতো ভাই জামির বিশ্বাস ও মতিয়ার বিশ্বাসও উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, সেদিন হাকিম মণ্ডলের পক্ষের লোকজন মতিয়ার বিশ্বাসকে মারধর করে। এর জেরে শনিবার জামির বিশ্বাস ও মুক্তার বিশ্বাসের লোকজন হাকিম মণ্ডলকে একা পেয়ে মারধর করেন। এর পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
স্থানীয়রা জানান, রোববার সকাল থেকে হাকিম মণ্ডলের পক্ষের লোকজন দড়ি বাংলাট, বড় বাংলাট ও পারকুল গ্রামে জড়ো হতে থাকেন। এসব গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট নদী সিরাজপুর হাওর। নদীর অপর পাড়ে রয়েছে পাট্টা ইউনিয়নের ঢেঁপা-মাজাইল গ্রাম।
রোববার সকালে হাকিম মণ্ডলের সমর্থকেরা নদী পার হয়ে ঢেঁপা-মাজাইল গ্রামে প্রবেশের চেষ্টা করলে জামির বিশ্বাস ও মতিয়ার বিশ্বাসের নেতৃত্বে স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন জামির বিশ্বাস, আমিন বিশ্বাস ও তৌফাজ্জেল বিশ্বাসসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জামির বিশ্বাসকে প্রথমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
জামির বিশ্বাসের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাত ১০টার পর বড় বাংলাট, দড়ি বাংলাট ও পারকুল গ্রামের শতাধিক বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি বাড়ি থেকে এখনও ধোঁয়া বের হচ্ছে। অনেক বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করে তছনছ করে রাখা হয়েছে। পেঁয়াজ সংরক্ষণের ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। ফ্রিজ, টেলিভিশন, খাট, আলমারি, তোষকসহ গৃহস্থালির বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুর করা হয়েছে। একাধিক মুদি দোকান ভেঙে লুটপাট করা হয়েছে। অনেক বাড়ির দরজা-জানালা ও টিনের বেড়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা যাওয়ার সময় গবাদিপশু ও মূল্যবান মালামালও নিয়ে গেছে।
বড় বাংলাট গ্রামের বাসিন্দা রেহেনা বেগম বলেন, “আমার স্বামী হাকিম মণ্ডলের সমাজের লোক। রাত ১০টার পর শত শত মানুষ এসে হামলা চালায়। আমাদের স্বামীর তিন ভাইয়ের তিনটি পাকা বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পেঁয়াজের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। গরু-ছাগল নিয়ে গেছে। আমরা ফায়ার সার্ভিসে খবর দিয়েছিলাম, কিন্তু তাদেরও ঘটনাস্থলে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে।”
দড়ি বাংলাট গ্রামের জামেনা বেগম বলেন, “রাতভর ওরা তাণ্ডব চালিয়েছে। আমার ছেলের মুদি দোকান ভেঙে লুট করেছে। বাড়িঘরেও হামলা করেছে। এখন আমার ছেলে ও নাতিরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আছে।”
নিহত জামির বিশ্বাসের ভাতিজা আজমল বিশ্বাস বলেন, “প্রশাসন সময়মতো কার্যকর ভূমিকা নিলে আমার চাচার মৃত্যু হতো না। পুলিশের সামনেই তাকে মারধর করা হয়েছে। পরে কারা বাড়িঘরে হামলা করেছে, সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।”
নিহতের আরেক ভাতিজা আকুল বিশ্বাস বলেন, “আমার তিন চাচা গুরুতর আহত হয়েছিলেন। আমরা তাদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এর মধ্যে একজন মারা গেলেন, অন্য দুজন হাসপাতালে। রাতে কারা হামলা করেছে আমরা জানি না। অন্য কেউ পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের ফাঁসানোরও চেষ্টা করতে পারে।”
পাংশা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মঈনুল ইসলাম বলেন, “জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পরে একজন আহত ব্যক্তি মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর রাতে কয়েকটি স্থানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।”
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় সবাই পুলিশকে দোষারোপ করে। কিন্তু ওই সময় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও বিষয়টি অবগত আছেন। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
পাংশা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের লিডার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “রাত ১টা ২৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে আমরা রওনা দিই। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং বাধার মুখে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারিনি। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে আমরাও অনিরাপদ অবস্থায় পড়ে যাই।”
এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
© All rights reserved Rajbari Express © 2025
এই নিউজ পোর্টালের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অথবা অডিও
অনুমতি ছাড়া ব্যাবহার বে-আইনি।