1. njnaimofficial@gmail.com : Naim Sheikh : Naim Sheikh
  2. biswass443@gmail.com : Sumon Biswas : Sumon Biswas
  3. admin@rajbariexpress.com : Rajbari Express :
মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন
  •                          

রাজবাড়ী এক্সপ্রেস ইপেপার

ঘোষণা:
জাতীয় অনলাইন গনমাধ্যম নীতিমালা আইনে তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধন আবেদিত।

চন্দনার তীরে জন্ম নেওয়া বাউল পাপ্পু ফকির: মাটির সুরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার নিরলস স্বপ্নযাত্রা।

রেজওয়ান হোসেন
  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ২৪৯ মোট পাঠক

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের ইলিশকোল গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঐতিহ্যবাহী চন্দনা নদী। নদীর ঢেউ, পাখির ডাক, মাঠের সবুজ আর গ্রামীণ জীবনের সরলতা—এসবই যেন মিশে আছে বাউল পাপ্পু ফকিরের কণ্ঠে। লোকসংগীতের এই নিবেদিতপ্রাণ আজ তিনি বাংলার হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতির একজন নিরলস সাধক, ও প্রচারক।

শৈশব থেকেই পাপ্পু ফকির বেড়ে উঠেছেন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে। বাবা-মায়ের উৎসাহ এবং পরিবারের শিল্পমনস্ক আবহ তাঁর সংগীতচর্চার ভিত গড়ে দেয়। ছোটবেলায় গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রথমবারের মতো স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে সবার প্রশংসা অর্জন করেন। সেই ছোট্ট মঞ্চই যেন হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম পদক্ষেপ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সংগীতচর্চা আরও বিস্তৃত হতে থাকে। বালিয়াকান্দি অফিসার্স ক্লাব, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে থাকেন। লোকসংগীত, বাউলগান, মরমী সংগীত ও ভাবসংগীতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ তাঁকে দ্রুত অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

পাপ্পু ফকিরের শিল্পীজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় আধ্যাত্মিক সাধক সাবের শাহ আল চিশতী নিজামীর সান্নিধ্যে আসার মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক দর্শন, মানবতাবাদ এবং মরমী ভাবধারার শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি, মানবপ্রেম, সাম্য, সহমর্মিতা এবং আত্মোপলব্ধির এক গভীর বার্তা বহন করতে শুরু করে।

পাপ্পু ফকির মনে করেন, বাউলধারা কেবল একটি সংগীতধারা নয়; এটি একটি জীবনদর্শন। মানুষের অন্তরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার যে সাধনা, বাউলগান সেই সাধনারই বহিঃপ্রকাশ। তাঁর পরিবেশিত গানগুলোতে তাই বারবার উঠে আসে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং আত্মিক মুক্তির আহ্বান।

শিল্পচর্চার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন সমান মনোযোগী। ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। শিক্ষার আলো তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিল্পীর জন্য জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই তাঁর গান ও বক্তব্যে লোকজ ঐতিহ্যের পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ ও মানবতার নানা দিক প্রতিফলিত হয়।

জাতীয় পর্যায়েও পাপ্পু ফকিরের সংগীত প্রতিভা স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), চ্যানেল এস, নাগরিক টিভি এবং নেক্সাস টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন। এসব অনুষ্ঠানে তাঁর পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। টেলিভিশনের পর্দা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব ও লোকসংগীতের আসরে তাঁর উপস্থিতি আজ পরিচিত এক নাম।

বিশেষ করে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে একাধিক মৌলিক গান ও মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করেন। তাঁর গানগুলোর বিষয়বস্তুতে স্থান পায় গ্রামীণ জীবন, মানবতা, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা এবং বাংলা লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদান। শ্রোতাদের কাছে তাঁর মৌলিক গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইতিবাচক সাড়া ফেলে।

লোকসংগীতের সংরক্ষণ ও প্রসারের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “গৌর ব্যান্ড” নামে একটি সংগীত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত নতুন গান রচনা, সুরারোপ, সংগীতায়ন এবং ভিডিও নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি তরুণ শিল্পীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, লোকগানের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।

পাপ্পু ফকির মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে লোকসংগীতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। তবে সেই উপস্থাপনা যেন কখনো মূল ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। তিনি বলেন, “লোকসংগীত আমাদের শিকড়ের পরিচয়। এই সংগীতের ভেতরে রয়েছে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনবোধ এবং মানুষের গল্প। তাই এটিকে আধুনিক মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে, কিন্তু তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে।”

তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ সংগীতচর্চায় আগ্রহী হলেও লোকসংগীতের প্রতি আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মশালা, আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্ম যদি নিজেদের শিকড়কে চিনতে শেখে, তবে লোকসংগীতের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে।

নিজের সংগীত দর্শন সম্পর্কে পাপ্পু ফকির বলেন, “সংগীত শুধু বিনোদনের বিষয় নয়। সংগীত মানুষের আত্মার খাদ্য। আমি বিশ্বাস করি, আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস যেমন মানুষের জীবনের মৌলিক উপাদান, তেমনি সংগীতও মানুষের জীবনকে পরিপূর্ণ করে। একজন ভালো শিল্পী হওয়ার আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া জরুরি।”

তাঁর এই দর্শনই তাঁকে অন্যান্য শিল্পীদের থেকে আলাদা করে। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত বিনয়ী ও সাদাসিধে এই শিল্পী সবসময় মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন। স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি একজন অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং লোকসংগীতের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের লোকসংগীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার স্বপ্নও লালন করেন পাপ্পু ফকির। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লোকসংগীত নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও চর্চা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাউল, ফকির, মরমী ও লোকসংগীতের ঐতিহ্যও আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এজন্য তিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

চন্দনা নদীর তীরের সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া পাপ্পু ফকিরের পথচলা আজ অনেক দূর এগিয়েছে। তবে তাঁর স্বপ্নের গন্তব্য এখনো সামনে। তিনি চান, বাংলার মাটির সুর একদিন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যাক। বিদেশের মঞ্চে, আন্তর্জাতিক উৎসবে এবং বিশ্বসংস্কৃতির অঙ্গনে উচ্চারিত হোক বাংলার লোকগানের নাম।

চন্দনার কলতান, গ্রামের মাটির গন্ধ আর মানুষের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা নিয়ে বাউল পাপ্পু ফকির এগিয়ে চলেছেন তাঁর স্বপ্নের পথে। এটি বাংলার লোকসংগীত, লোকঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক অনবদ্য অভিযাত্রা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরণের আরও খবর

© All rights reserved Rajbari Express © 2025

এই নিউজ পোর্টালের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অথবা অডিও

অনুমতি ছাড়া ব্যাবহার বে-আইনি।